প্রতি বছর হিমালয়ের কোলে অবস্থিত অমরনাথ গুহায় প্রাকৃতিক ভাবে বরফ জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয় এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই বরফের শিবলিঙ্গ দর্শনের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অমরনাথ যাত্রায় অংশ নেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই প্রাকৃতিক বরফের শিবলিঙ্গই ভগবান শিবের প্রতীক, তাই এর গুরুত্ব ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক—দুই দিক থেকেই অত্যন্ত বেশি।
তবে গত কয়েক বছর ধরে যাত্রা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই বরফের শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যাত্রার প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই প্রায় পুরো শিবলিঙ্গ গলে যাওয়ার খবর সামনে এসেছে। ফলে বহু ভক্তের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে, কারণ তাঁরা গুহায় পৌঁছানোর আগেই পবিত্র বরফের শিবলিঙ্গ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হল ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কাশ্মীর উপত্যকায় গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি শীতকালে আগের তুলনায় কম তুষারপাত হচ্ছে। এর ফলে গ্রীষ্মের শুরুতেই বরফ দ্রুত গলতে শুরু করছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, অনিয়মিত আবহাওয়া, তাপপ্রবাহ এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আগে যেখানে অমরনাথ গুহার বরফের শিবলিঙ্গ যাত্রার অধিকাংশ সময় ধরে অটুট থাকত, এখন তা কয়েক দিনের মধ্যেই গলে ছোট হয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছর ধরেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় প্রতীকের দ্রুত বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। হিমবাহ গলে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
অন্যদিকে, অনেক ভক্তের মতে, অমরনাথ যাত্রায় প্রতিবছর বাড়তে থাকা মানুষের সংখ্যা এবং গুহা এলাকার আশেপাশে মানুষের কার্যকলাপও পরিবেশের উপর কিছুটা প্রভাব ফেলছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবুও পরিবেশ রক্ষায় আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাত্রাপথে নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিষেবা জোরদার করা হলেও, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এই পবিত্র বরফের শিবলিঙ্গকে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে হলে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই ‘বাবা বরফানি’-র দ্রুত গলে যাওয়া শুধু ভক্তদের আবেগকেই নাড়া দেয়নি, বরং হিমালয়ের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবারও বার্তা দিয়েছে। আগামী বছরগুলিতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা শুধু অমরনাথ যাত্রার ক্ষেত্রেই নয়, সমগ্র হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ