“কীবোর্ডে ABCD নয়, QWERTY কেন? জানুন আসল রহস্য”

নিউজ বাংলা প্লাস: কম্পিউটার বা মোবাইলের কীবোর্ডে টাইপ করতে গিয়ে কখনও কি আপনি ভেবে দেখেছেন—ইংরেজি অক্ষরগুলো কেন A, B, C, D… এই স্বাভাবিক ক্রমে সাজানো নেই? বরং কীবোর্ডের একেবারে ওপরের সারিতে দেখা যায় QWERTY। এই অদ্ভুত বিন্যাসের পেছনে রয়েছে প্রযুক্তির ইতিহাস, টাইপরাইটারের যুগ এবং টাইপিংয়ের গতি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প। চলুন জেনে নেওয়া যাক এর আসল রহস্য কি!
আজকের QWERTY কীবোর্ডের ইতিহাস শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। তখন কম্পিউটার তো দূরের কথা, টাইপরাইটারও ছিল নতুন প্রযুক্তি। ১৮৬০-এর দশকে বিভিন্ন ধরনের টাইপরাইটার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। প্রথম দিকের কিছু যন্ত্রে অক্ষরগুলো তুলনামূলকভাবে বর্ণানুক্রমে সাজানো ছিল। কিন্তু দ্রুত টাইপ করার সময় একটি বড় সমস্যা দেখা দেয়।

পুরনো টাইপরাইটারে প্রতিটি অক্ষরের জন্য আলাদা ধাতব টাইপবার বা হাতুড়ির মতো অংশ থাকত। কাছাকাছি থাকা দুটি অক্ষর দ্রুত পরপর চাপলে সংশ্লিষ্ট টাইপবারগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটকে যেতে পারত। ফলে টাইপিংয়ে সমস্যা তৈরি হতো এবং ব্যবহারকারীকে বারবার টাইপবার আলাদা করতে হতো।

এই সমস্যা কমানোর জন্য কীবোর্ডের অক্ষরগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা শুরু হয়। টাইপরাইটার নির্মাতারা এমন একটি বিন্যাস তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যাতে বহুল ব্যবহৃত অক্ষরগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে যে টাইপবারের সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমে যায়। ধীরে ধীরে এমন একটি বিন্যাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার ওপরের সারির প্রথম ছয়টি অক্ষর হলো Q-W-E-R-T-Y। সেখান থেকেই এর নাম হয় QWERTY।

তবে জনপ্রিয় একটি ধারণা হলো—QWERTY কেবল টাইপিং ধীর করার জন্য তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি এতটা সরল নয়। টাইপবারের সংঘর্ষ কমানো অবশ্যই নকশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু কীবোর্ডের বিন্যাসের পেছনে আরও কিছু বাস্তব ও বাণিজ্যিক কারণ কাজ করেছিল।

১৮৭০-এর দশকে রেমিংটনের মতো টাইপরাইটার নির্মাতারা QWERTY বিন্যাসের টাইপরাইটার বাজারে আনতে শুরু করেন। টাইপিস্টরা এই বিন্যাসে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেটিই ধীরে ধীরে একটি শিল্পমান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটার এবং পরে স্মার্টফোনের ফিজিক্যাল ও ভার্চুয়াল কীবোর্ডেও QWERTY বহুল ব্যবহৃত হতে থাকে।

মজার বিষয় হলো, QWERTY-এর চেয়ে অন্য কিছু কীবোর্ড বিন্যাসও তৈরি হয়েছে। যেমন Dvorak এবং Colemak। এগুলোর লক্ষ্য ছিল আঙুলের চলাচল কমিয়ে দ্রুত ও আরামদায়ক টাইপিংয়ের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু QWERTY-এর দীর্ঘদিনের ব্যবহার, মানুষের অভ্যাস, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যারের ব্যাপক সমর্থনের কারণে সেটিকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হয়নি।

অর্থাৎ, কীবোর্ডে ABCD না থাকার পেছনে কোনো রহস্যময় ষড়যন্ত্র নেই। বরং এটি প্রযুক্তির বিবর্তনের একটি দারুণ উদাহরণ। পুরনো টাইপরাইটারের যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি নকশা সময়ের সঙ্গে মানুষের অভ্যাস ও প্রযুক্তির অংশ হয়ে গেছে।

আজ আমরা যখন কম্পিউটার বা ফোনে অনায়াসে QWERTY কীবোর্ড ব্যবহার করি, তখন আসলে দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের উত্তরাধিকার বহন করছি। অর্থাৎ, কীবোর্ডের অক্ষরগুলোর এই অদ্ভুত বিন্যাস শুধু অক্ষর সাজানোর ব্যাপার নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাইপরাইটারের ইতিহাস, প্রযুক্তিগত সমস্যা, বাজারের প্রভাব এবং মানুষের অভ্যাসের দীর্ঘ গল্প।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ