প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত ট্রোমসো শহরে দেখা যায় ‘মিডনাইট সান’ বা মধ্যরাতের সূর্যের অপূর্ব দৃশ্য। রাত বারোটা, একটা কিংবা দুটো— সময় যাই হোক না কেন, আকাশে তখনও সূর্যের আলো উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বিরল এই দৃশ্য স্বাভাবিক ঘটনা হলেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা দৃশ্য দেখার জন্য ছুটে আসেন ইউরোপের ট্রোমসো শহরে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর অক্ষ ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে থাকার কারণেই এই ঘটনা ঘটে। গ্রীষ্মকালে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। ফলে আর্কটিক সার্কেলের উত্তর দিকে অবস্থিত অঞ্চলগুলিতে সূর্য দীর্ঘ সময় ধরে দিগন্তের নিচে নামে না। ট্রোমসো শহর আর্কটিক সার্কেলের অনেকটা উত্তরে হওয়ায় সেখানে প্রায় সত্তর দিন ধরে সূর্যাস্ত দেখা যায় না।
মধ্যরাতের সূর্যের এই অভিজ্ঞতা প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। অনেকেই রাতের বেলায় পাহাড়ে ট্রেকিং, মাছ ধরা, সাইকেল চালানো কিংবা নৌভ্রমণের মতো ক্রিয়াকলাপে অংশ নেন। কারণ সূর্যের আলো থাকায় সময়ের কোনও বাধা থাকে না। রাত দুটোর সময়ও মানুষকে রাস্তায় হাঁটতে, ছবি তুলতে কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেখা যায়।
তবে এই দীর্ঘ দিনের আলোর কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসে। সূর্যের আলো থাকার কারণে অনেকের ঘুমাতে অসুবিধা হয়। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরের জানালায় বিশেষ ধরনের পর্দা ব্যবহার করেন, যাতে ঘর অন্ধকার রাখা যায় এবং স্বাভাবিক ভাবে ঘুমানো যায়।
শুধু গ্রীষ্মকালেই নয়, শীতকালে ট্রোমসোর চিত্র আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। নভেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সেখানে সূর্য প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এই সময়কে বলা হয় ‘পোলার নাইট’ বা মেরু রাত্রি। অর্থাৎ বছরের এক সময় টানা দিনের আলো, আর অন্য সময় দীর্ঘ অন্ধকার— প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য ট্রোমসোকে আরও রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
নরওয়ের পর্যটন শিল্পের জন্য এই মধ্যরাতের সূর্য একটি বড় সম্পদ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে নরওয়েতে ভিড় জমান। স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটন ব্যবসাও এর ফলে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়। পর্যটকদের জন্য, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে শহরজুড়ে উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আউটডোর কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়।
বিশ্বে আরও কয়েকটি দেশে মধ্যরাতের সূর্যের দেখা মিললেও ট্রোমসো তার সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পর্যটন সুবিধার জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বরফে ঢাকা পাহাড়, নীল সমুদ্র আর সূর্যের অবিরাম আলো— সব মিলিয়ে এই শহর যেন প্রকৃতির এক আশ্চর্য উপহার।
সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত মানুষের জীবনের এক স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ট্রোমসো এমন একটি শহর, যেখানে টানা সত্তর দিন সূর্য অস্ত যায় না, তা সত্যিই বিস্ময়কর। প্রকৃতির এই অনন্য রহস্য আজও পৃথিবীর মানুষের কাছে এক বড় আকর্ষণ এবং বিস্ময়ের বিষয় হয়ে রয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ