২০২৬ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতলেন মীরাবাই চানু। তিরন্দাজ হওয়ার স্বপ্ন থেকে বিশ্বজয় এবং কঠিন দিনে ট্রাকচালকদের সহযোগিতার এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।

নিউজ বাংলা প্লাস, ইম্ফল: কাঠুরিয়ার মেয়ে থেকে বিশ্বমঞ্চের নায়িকা—ভারতের তারকা ভারোত্তোলক সাইখোম মীরাবাই চানুর জীবনকাহিনি যেন কোনো নাটকীয় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। তবে তাঁর এই রূপকথার মতো সাফল্যের পেছনে শুধুই পদক আর জয়ের ঝকঝকে আলো নেই; জড়িয়ে রয়েছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম, চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই এবং একঝাঁক অচেনা সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা। ২০২৬ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে সোনা জিতে তিনি ফের একবার ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছেন। এটি কমনওয়েলথ গেমসে তাঁর টানা তৃতীয় স্বর্ণপদক এবং মোট চতুর্থ সাফল্য।

মণিপুরের নংপোক কাকচিং গ্রামের এক অতি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠেন মীরাবাই। শৈশবে পাহাড়ি জঙ্গল থেকে পরিবারের জন্য ভারী জ্বালানির কাঠ বয়ে আনাই ছিল তাঁর নিত্যদিনের কাজ। পরবর্তীতে সেই ভারী কাঠ বহনের শারীরিক ধকলই হয়ে ওঠে তাঁর ভিতরের অপ্রতিরোধ্য শক্তির উৎস। অবশ্য ক্রীড়াজগতে পা রাখার সূচনায় ভারোত্তোলক হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তাঁর; স্বপ্ন ছিল একজন দক্ষ তিরন্দাজ হওয়ার।
জীবন পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি হয় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়। ভারতের কিংবদন্তি ভারোত্তোলক কুঞ্জরানি দেবীর সাফল্য ও লড়াইয়ের কাহিনি মীরাবাইয়ের মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিরন্দাজির স্বপ্ন সরিয়ে রেখে তিনি মন দেন ভারোত্তোলনের কোর্টে।
তবে সাফল্যের রাস্তা একেবারেই মসৃণ ছিল না। গ্রাম থেকে ইম্ফলের প্রশিক্ষণকেন্দ্রের দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫ কিলোমিটার। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেই কঠিন সময়ে মীরাবাইয়ের পাশে এসে দাঁড়ান নদীর বালি পরিবহনকারী ট্রাকচালকেরা। প্রতিদিন ভোরে বালি বোঝাই ট্রাকে করেই ইম্ফলে অনুশীলনে যেতেন তিনি। সেই সাধারণ মানুষগুলোর সহযোগিতাই মীরাবাইয়ের স্বপ্নকে মাঝপথে থমকে যেতে দেয়নি।
গ্লাসগোর মঞ্চে স্ন্যাচে ৮৫ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১০৫ কেজি মিলিয়ে মোট ১৯০ কেজি ওজন তুলে প্রতিপক্ষদের পেছনে ফেলে দেন মীরাবাই। এই জয়ের সাথে সাথে একাধিক নতুন রেকর্ডও যোগ হয় তাঁর ঝুলিতে।
কাঠ কুড়ানো সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ বিশ্বজয়ী। মীরাবাই চানুর এই যাত্রা কেবল ক্রীড়াজগতের এক অনন্য নজির নয়, বরং তা শত প্রতিকূলতার মুখেও স্বপ্ন জয়ের এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ