বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর! নেপালের লুকলা

কাঠমান্ডু, নেপাল: বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত নেপালের লুকলা বিমানবন্দর, যার সরকারি নাম তেনজিং-হিলারি বিমানবন্দর। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই বিমানবন্দর বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণে যাওয়া পর্যটক ও অভিযাত্রীদের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮৪৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি তার ছোট রানওয়ে, দুর্গম অবস্থান এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। মাত্র ৫২৭ মিটার দীর্ঘ রানওয়েটি একদিকে পাহাড়ের ঢালে শেষ হয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে গভীর খাদ। এছাড়া রানওয়েটির প্রায় ১২ শতাংশ ঢাল অবতরণ ও উড্ডয়নকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লুকলা বিমানবন্দরে অবতরণ বা উড্ডয়নের জন্য পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এখানে কেবল স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম (STOL) ছোট আকারের বিমান পরিচালনা করা হয়। বড় যাত্রীবাহী বিমান এই বিমানবন্দরে চলাচল করতে পারে না।

লুকলার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া। পাহাড়ি অঞ্চলে মুহূর্তের মধ্যে কুয়াশা, প্রবল বাতাস বা মেঘের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে অনেক সময় নির্ধারিত ফ্লাইট বিলম্বিত হয় বা বাতিল করতে হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে বিমান চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ।

এই বিমানবন্দরটির নামকরণ করা হয়েছে এভারেস্ট বিজয়ী দুই কিংবদন্তি পর্বতারোহী স্যার এডমুন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগের সম্মানে। ১৯৫৩ সালে তারা প্রথম সফলভাবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে এভারেস্ট অঞ্চলের উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার্থে লুকলায় বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়।

পর্যটন শিল্পে লুকলা বিমানবন্দরের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেক, গোকিও লেক ট্রেকসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় ট্রেকিং রুটের যাত্রা এখান থেকেই শুরু হয়। পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও এটি খাদ্য, ওষুধ এবং জরুরি সরঞ্জাম পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

যদিও অতীতে প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পরিবেশের কারণে এখানে কয়েকটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, তবুও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। কঠোর নিয়ম, অভিজ্ঞ পাইলট এবং আধুনিক পরিচালনা ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

বিশ্বজুড়ে রোমাঞ্চপ্রেমী ভ্রমণকারী ও পর্বতারোহীদের কাছে লুকলা বিমানবন্দর এক অনন্য অভিজ্ঞতার প্রতীক। ঝুঁকি থাকলেও হিমালয়ের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এভারেস্ট অভিযানের সূচনাবিন্দু হিসেবে এই বিমানবন্দর আজও বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে রয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ